চরমপন্থা, মতবাদ এবং মানবিক সমাজ: একটি বিশ্লেষণ
মানব ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান দেখায় যে, যেকোনো মতবাদ—ধর্ম, রাজনৈতিক ধারণা, বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ন্যারেটিভ যেমন নার্সিসিজম—সদস্যদের মধ্যে একই ধরনের ধারা তৈরি করে। অনুসারীদের বৃহৎ অংশ সাধারণভাবে দৈনন্দিন জীবনযাপন করে, নীরব এবং নিষ্ক্রিয় থাকে। তারা নেতৃত্বের জন্য লড়াই করে না, ক্ষমতার জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় না। তবে এই বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ অংশের ভেতর থেকে ছোট একটি সংখ্যালঘু অংশ চরমপন্থী হয়ে ওঠে। এই সংখ্যালঘু চরমপন্থী বিশ্বাস করে তারা নেতা হওয়ার যোগ্য এবং ক্ষমতা অর্জনের অধিকার তাদেরই বেশি।
এই সংখ্যালঘু চরমপন্থীর কর্মকাণ্ডই শেষ পর্যন্ত পুরো গোষ্ঠীর গতিপথ নির্ধারণ করে। নিষ্ক্রিয় সাধারণ অংশ অজান্তে এই চরমপন্থী কর্মকাণ্ডকে সমর্থন বা রক্ষা করে, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে চরমপন্থাকে পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটি সামাজিক মনোবিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে “Silent majority effect” নামে পরিচিত।
ইতিহাস এবং বাস্তবতার আলোকেও দেখা যায়—চরমপন্থীরাই সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘটায়। তারা সংঘর্ষ, যুদ্ধ, নারী নির্যাতন, জাতিগত সহিংসতা এবং ধর্মীয় দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত থাকে। এই ধরনের আচরণ সাধারণ মানুষের নয়; এর জন্য প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ, সংগঠিত ও সচেতন পরিকল্পনা। এছাড়া, যৌনভিত্তিক আচরণের পরিসংখ্যান দেখায় চরমপন্থীদের অধিকাংশই পুরুষ। যা evolutionary এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রয়োজন ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সচেতন সমাজের চর্চা। কারণ মতবাদ তখনই বিপজ্জনক হয় যখন ক্ষমতার জন্য ব্যবহৃত হয়, আর তখন বিজ্ঞানও কখনো কখনো মানবতার বিপক্ষে ব্যবহৃত হয়—যেমন বর্ণবাদ, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, দমনমূলক প্রযুক্তি, বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে।
সুতরাং চরমপন্থা কমানোর একমাত্র কার্যকর পথ হলো—বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা ও বিজ্ঞান চর্চা, যুক্তিনিষ্ঠ সমাজ, মানবিক মূল্যবোধ, এবং ন্যায়পরায়ণ শিক্ষা। এরফলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শান্তিপ্রিয় হবে, এবং সংখ্যালঘু চরমপন্থীরা সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এক কথায়, মানবিক ও সেকুলার ও বিজ্ঞানচর্চাকারী সমাজই চরমপন্থার পুনরুৎপাদন বন্ধ করতে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
Comments
Post a Comment